এক রাত্রির গল্প

লেখক – বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

গল্পটি আত্মজা পাবলিশার্স কর্তৃক প্রকাশিত মেঘা ও রাত্রির গল্প বইটির থেকে নেওয়া। গল্পটি লেখক এবং প্রকাশকের অনুমতিক্রমে আমরা পাঠ করলাম।

 

আমার নাম রাত্রি। আমি ভালবাসি অন্ধকার। রাত্রির এক শান্ত, গভীর রূপ আছে, যা আমাকে টানে। যা আমাকে প্রেরণা দেয়, আমাকে ডেস্কে বসায়, আমি লিখতে বসি- মাঝে মাঝে গ্রামাফোনে শুনি রাত্রির সঙ্গীত, সিডি-তে বাজে অন্ধকারের গান, সমুদ্রের আওয়াজ। অন্ধকারের হাত ধরেই আসে আলো, তার রং ফিকে কালো, তার স্বভাব তত ভাল নয়। তাকে সহ্য করি, আর একটু একটু করে বড় হই। একদিন জানতে পারি আমার জন্মমূহূর্তও ছিল ঘোর অন্ধকার। বাঁচার আশা ছিল না। গলায় সাপের মতো জড়ানো ছিল নাড়ি। ডাক্তারবাবু সেই অন্ধকার থেকে আমায় নিয়ে এলেন আলোয়। এক সময় আমি চোখ খুললাম, কেঁদে উঠলাম। বাবা আর ঠাকুমা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু মা’র অবস্থা ক্রমে খারাপ হচ্ছিল। মা’কে পাঠানো হল অন্য নার্সিংহোমে। দু’বোতল রক্ত নিয়ে, চোখে কালিপড়া আমার মা বাড়ি ফিরলেন, আয়ার হাত ধরে। জন্মের পর প্রথম তিন মাস আমি আয়াদিদির হাতে মানুষ হলাম।
তিন মাস পর আমাকে প্রথম দেখে মা কেমন যেন চমকে উঠেছিলেন। “ও আমায় মেয়ে?” আয়াদিদি বলল, “হ্যাঁ, তোমারই তো, চিনতে পারছ না?” ঠাকুমা বললেন, “দেখো এই তো আমার দিদিভাই।” বাবা বললেন, “না, ও শুধু আমার মেয়ে। তোমার কেন হবে?”
মা বললেন, “আচ্ছা,” তারপর মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরে জানলাম আমার আর মা’র রক্তের গ্রুপ ছিল আলাদা। অবশ্য তা তো হতেই পারে। একটু একটু করে আমি অন্য সবার থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি দেখতাম রাতের গাছপালা কেমন হাত নাড়ে, রাতের পাখিরা গান শোনায়, আর রাত্রির আগোচরে বই পড়ে, গান শুনে, ডায়রি লিখে আর ছবিতে রং-তুলি লাগিয়ে আমি পরবর্তী রাত্রি বা অন্ধকারের অপেক্ষায় থাকি। বন্ধুরা বলে, “নিশাচরী।” প্রমা ঠাট্টা করে বলে “উইচ”। অনিন্দ্য ডাকে, “উইলো দ্য উইম্প।” বাবা আমার নির্বিকল্প, কিছুই বলেন না। আর আমার মা সারাদিন ধরে পরের দিনের জন্য কাজ করে যান। কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও। বিছানা তোলা, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার করা, টিফিন বানানো ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর কাজ ফুরোবার নয়।
একদিন ভগবান আমার সঙ্গে কথা বলেন। তারপর থেকে আমিও মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে সেলফোনে মেসেজ পাঠান। আমি তাঁকে মেল করি, নিয়মিত। “কে তোকে মেসেজ করে এত? এত রাতে?”

মা’কে বলি, “ভগবান।”
“কার সঙ্গে চ্যাট করিস সারা রাত?”
বন্ধুদের বলি, “ভগবানের সঙ্গে।”
আমি দিনে ঝিমোই, রাতে স্বপ্ন দেখি। অন্ধকারের স্বপ্ন, আমার ভাললাগার স্বপ্ন। আমি সন, তারিখ-সহ স্বপ্নের কথা ডায়রিতে লিখে রাখি। আমার সঙ্গে ভগবানের কথোপকথন আমি টুকে রাখি গোপন নোটবুকে।
মা’র মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে। বাবাকে বলেন, “এ সব কী হচ্ছে? মেয়েকে দেখো।” বাবা চুপ করে থাকেন। বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে। ইমন প্রমাকে বলে, “মেয়েটার কী যে হবে!”
শান্তনু মেসেজ করে, “আজ কেমন আছিস?”
আমি জানাই, “কেমন আবার, ভালই তো।”
আমার এ সব ভাল লাগে না। উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিই।
আমি একটার পর একটা পরীক্ষায় পাশ দিই আর ডায়েরি ও নোটবুক অক্ষরে অক্ষরে ভরে ওঠে। গোপন ক্যানভাসে এঁকে রাখি অন্ধকারের ছবি। সাদা কালো অন্ধকার, বিমূর্ত অন্ধকার।
বাবা ডাক্তার জেঠুকে ফোন করেন। এক দিন। ফোন পেয়ে ডাক্তার জেঠু আমাকে দেখতে আসেন।
“কেমন আছ রাত্রি?”
“ভাল আছি।”
“ঘুম হয়?”
“হ্যাঁ”
“খিদে পায়?”
“হ্যাঁ”
“পড়াশোনা?”
“ভাল”, পাশ থেকে বাবা বলে ওঠেন।
“ওকে বলতে দাও” মা বাবাকে বকেন। চা খেতে খেতে ডাক্তার জেঠু জিজ্ঞেস করেন, “রাত্রি তুমি কথা বলেছ ভগবানের সঙ্গে?”
“হ্যাঁ জেঠু।”
“তাঁকে দেখেছ কি?”
“হ্যাঁ জেঠু”
“কী রকম দেখতে তাঁকে?”
“ওই যে অন্ধকারের মতো।”
এর মধ্যে টুংটাং করে আমার মোবাইলে মেসেজ আসে। আমি দূরে গিয়ে মেসেজ পড়তে থাকি। আমি বুঝতে পারি বাবার সঙ্গে ডাক্তার জেঠুর কথা হয় ফোনে। বাবার সঙ্গে মা’র ঝগড়া হয় আমাকে নিয়ে। তারপর একদিন আসেন এক নতুন ডাক্তার কাকু। তিনি টাই পড়েন কম কথা বলেন। গায়ে বিদেশি পারফিউমের গন্ধ। তিনি আমায় মাত্র কয়েকটি প্রশ্ন করেন। আমি যথাসাধ্য উত্তর দিই। তারপর তিনি বের করেন এক ছাপানো প্রশ্নপত্র। আমি উত্তর লিখি। ডাক্তার কাকু উত্তর নিয়ে চলে যান। চাপা গলায় কী সব বলেন, আমি বুঝি না। এক দিন একটা কালো গাড়ি আসে বাড়ির সামনের রাস্তায়। হন্তদন্ত হয়ে উঠে আসেন ডাক্তার কাকু। “তোমাকে যেতে হবে মামণি। একটু পরীক্ষার জন্য।”
“আমি যাব না।”
মা চুপ। বাবার মুখ থমথমে। তখন তিনি আমাকে একটা ওষুধ দেন। আর একটা ইঞ্জেকশন। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আর ঘুমের মধ্যেই কালো গাড়ি চেপে একটা কালো বাড়িতে চলে যাই, সেখানে শুধুই কালো মাথার ভীড়।
একসময় জেগে উঠে আমি বলি, “আমি কোথায়?” ওখানকার কালো মাথারা বলে, “হাসপাতাল।”
“কেন?”
“তোমার ঘুম হয় না তাই।”

আমি ওষুধ জিভের তলায় লুকিয়ে রাখি। তারপর সুযোগমত ফেলে দিই। খাবার ফেলে দিই। শুধু জল খাই। জল ছাড়া আর কিছু খাই না। এখানে কিস্যু নেই। সেলফোন নেই, মিউজিক সিস্টেম নেই, কম্পিউটার নেই। একটা ছোটো খাট আর ছাদ। এই নিয়ে একটা ঘর। আর তার পাশের ঘর, তার পাশের ঘর। সেখান থেকে মাঝে মাঝে চিৎকার শোনা যায়, কাচ ভাঙার শব্দ, কান্নার আওয়াজ। এখানে গাছপালা নেই। আছে চাপ চাপ অন্ধকার। পোষমানা অন্ধকার। ঘরটা যেন গিলে খেতে চায়। এই অন্ধকার ভাল লাগে না। শুধু কয়েকটা ভূতের মতো কালো কালো মাথা অন্ধকার মেখে বসে থাকে।
একদিন বন্ধুরা আসে, “কেমন আছিস?”
ওদের কেমন ঝাপসা লাগে। আমি কোনও উত্তর দিই না। ওরা আমাকে দেখে যেন ভয় পায়।
একদিন বাবা আসেন। “কেমন আছ বাবা?” বাবার কোনও উত্তর নেই। বাবা রোগা হয়ে গিয়েছেন। বাবা আমাকে দুটো চকোলেট দেন। ডার্ক চকলেট। আমি খুব ভালবাসি। বাবার চোখে জল। আমার কিন্তু কান্না নেই। ওরা আমাকে ওষুধের বদলে ইঞ্জেকশন দেয়। আমি ক্রমশ হারিয়ে যাই। আর স্বপ্ন দেখি না। ভগবান আর কথা বলেন না।
একদিন সাদা পোশাক পরা লম্বা একজন আমার দিকে তাকিয়ে বলে, “হাই বেবি!”
আমি তাকে দেখি। চিনতে পারি না। একজন দিদি বলেন, “উনি এখানকার ভিজিটিং ডাক্তার।”
সাদা পোশাকের ভিজিটিং ডাক্তার আমাকে বলেন, “এবার তোমার ছুটি। আচ্ছা, আর কি ভগবানের সঙ্গে তোমার কথা হয়?”
“না”
“অন্ধকারের ছবি দেখো?”
“না”
“ভেরি গুড। বাড়ি যাও তবে। সিস্টার ওর বাড়িতে খবর পাঠান আর ডিসচার্জ রেডি করুন।”

“কী হয়েছে আমার?”
ডাক্তার একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন “তোমার একটা অন্ধকার রোগ হয়েছিল। খারাপই বলতে হবে। যার নাম স্কি…, যাক গে, নামে কী আসে যায়? এখন ঠিকঠাক। ওষুধ খাবে। ভাল থাকবে। বাই।”
আমি বাড়ি ফিরে আসি। অন্ধকার পালিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে। চারদিকে আলো আর আলো। তীব্র, উজ্জ্বল চোখধাঁধানো আলো। ভালো লাগে না। বই পড়তে ভাল লাগে না। গান শুনতেও না। ছবি আঁকি না। ডায়রি লেখাও বন্ধ। ভূতের মতো জ্যান্ত গাছপালা, রংবেরঙের পাখি। এ কোথায় এলাম!
সেলফোন খুললাম। ইনবক্স খালি। একটা দুটো গেট ওয়েল সুন মেল এসেছে বন্ধুদের থেকে। আমি নাম না দেখেই ডিলিট করে দিই। আমি ভগবানকে মেল করি। আমার শেষ ইমেল। যা লেখার লিখি। তারপর চুপচাপ বসে থাকি। আমার ঘর। সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো। বাবার আনা টেডি বিয়ার আমার দিকে তাকিয়ে। হাসছে। মনে মনে দেখি একটা আঁকাবাঁকা সিঁড়ি। তার নীচে একটা ঘর। তার নীচে পাতাল। যার ভিতর চাপ চাপ অন্ধকার। আমার প্রিয় অন্ধকার। আমি উঠে দাঁড়াই, হাঁটতে থাকি।

মতামত দিন

You cannot copy any content of this Website