ফ্যাকাশে ক্যানভাস

লেখক – প্রবুদ্ধ মিত্র

গল্পটি আত্মজা পাবলিশার্স কর্তৃক প্রকাশিত যুদ্ধের বুদবুদ বইটির থেকে নেওয়া। গল্পটি লেখক এবং প্রকাশকের অনুমতিক্রমে আমরা পাঠ করলাম।

 

দেখতে দেখতে বাগানের সব ফুল একসঙ্গে রঙ বদলাতে বদলাতে সাদায় এসে স্থির হয়ে গেল। এতক্ষণে সব ফুল সাদা। লাল ফুল সাদা… বেগুনি ফুল সাদা… এবং হলুদ ফুলও… সাদা কৃষ্ণচূড়া। সাদা অপরাজিতা। সাদা সূর্যমুখী।

কেন গাছেরাও আস্তে আস্তে সাদা হয়ে যাবে এ প্রশ্নও আর উঠবে না। অবশ্যই সমস্ত সবুজ পাতা ক্রমশ সাদা হবে। একটা গোটা আস্ত বাগান থেকে সবরকম রং উধাও হয়ে না গেলে সে এখানে আসবেনা। তাই একে একে সব রং সাদায় বিলীন হবে। কারণ তার এখানে আসার শর্ত হলো সাদা চরাচরের বিছানা…

এরপর সব তাপ শুষে নেবে সে। তাপ থাকবে না বাগান বা বাগান সংলগ্ন কোথাও। রঙের বিবর্তন শেষ হলে তাপেও নিজেদের বদলাবে বাগান। কারণ, উষ্ণতার কোনো জায়গা নেই তার শর্তে। সব উষ্ণতা ঢেকে দেবে বরফ শীতলতা।

এরপর আসে আলো প্রসঙ্গ। আলোকে বদল করার প্রশ্ন নেই কারণ সে নিজেই বিবর্তনশীল। আলো থেকে মলিন আলো, তা থেকে আলো আঁধারি এবং সবশেষে আলো লোপাট আঁধার বর্তমান। আঁধারই যে শর্ত তার আগমনের।

বাকি রইলো গন্ধ ও শব্দ। আলোচ্য পরিবেশটির গন্ধ কেমন হবে সেটা ঠিক হওয়া শুধু বাকি আছে। একই রকম ভাবে শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট হওয়াও অমীমাংসিত।

বিস্তীর্ণ সাদা বিছানা হিমশীতল তাপমাত্রা আর অন্ধকার— এই হলো পূর্ণিমার মৃত্যুর আগাম শর্ত যা সে নিজে, মানে পূর্ণিমা মৃত্যুর সঙ্গে গোপন আলাপে জেনেছে। সেই অজানা কথাবার্তা থেকে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তা হলো ‘মৃত্যু’ ও পূর্ণিমা কেউই নিজের পুরোটা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। ‘মৃত্যু’ নিজের তিনটে শর্ত যেমন রং, তাপ ও আলো আরোপ করেছে পূর্ণিমার তিনটি ইচ্ছেকে সম্মান দিয়ে। সে তিনের প্রথমটি হলো মৃতের শয্যা। পূর্ণিমার বরাবরই ফুলের সমাহার বড়ো প্রিয়। সে বলেছিলো – ফুলের বাগান…

ওদিক থেকে জবাব ছিলো-মঞ্জুর…

অতঃপর গন্ধ। পূর্ণিমা আর্জি রেখেছিলো – আমি সময় এলেই জানাবো।

ওপাশের উত্তর-মঞ্জুর…

এভাবে পূর্ণিমার শব্দ-র বিষয়টা বকেয়া রাখার প্রস্তাবও ‘মঞ্জুর’ হয় বলে জানা যায়। কিন্তু কেন পূর্ণিমা-র এই বোঝাপড়া ‘মৃত্যু’র সঙ্গে? কারণ, সময়ের বহু আগেই সে একটা শেষ দেখতে চেয়েছিলো। জীবনের অন্তিম শয়ান।

উনিশ পেরোতে আর কয়েকটা দিন বাকি ছিলো। আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে ফয়সালায় এসেছিলো সে মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটবে। স্বপ্ন যে এরকম বেপরোয়াও হতে পারে তা ঐ সময়ের পূর্ণিমাকে না দেখলে বোঝার উপায় ছিলোনা।

ইতিহাসকে ভালোবেসে কলেজে ঢোকার কয়েকদিন পর অনার্স ক্লাসের মধ্যেই টের পায় অনেকগুলো জোড়া চোখ ওর চারপাশে ঘুরঘুর করছে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে পুরুষের নাগাল এড়ানোর মতো দুঃসাধ্য কাজ তার বয়সে কতটা কঠিন।

শুক্লপক্ষের শেষ দিনে তার জন্মের মুহূর্তটায় ওর গায়ের রং ছিলো পূর্ণ চাঁদের মতো আলোকোজ্জ্বল। নাতনির মুখ দেখে ঠাকুমা তাই এছাড়া আর কোনো নাম মাথায় আনেনি।

এ মেয়ের রূপে সবাই ধরাশায়ী হবে। এই ছিল ঠাকুমার ভবিষ্যৎ দৃষ্টি। ‘সবাই’ অর্থে যে সব পুরুষ তা না বললেও চলে। আর পুরুষকে ধরাশায়ী করতে কোন নারী না চায়। অন্তত ঐ উনিশ কুড়িতে।

নানান স্বপ্ন বিচ্ছিন্ন না থেকে জমাট বাঁধতে চায়। জমাট মেঘ হয়ে তুলোর মতো আকাশে বিচরণ…

তাই মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটতে চাওয়ার মতো বেপরোয়া সে। পা এ লাগাম দিয়ে ওকে বেঁধে রাখার চলতি চেষ্টা যে ওর বাবা মা করেনি তা নয়। কিন্তু আস্তে আস্তে বেলাগাম হয়ে ওঠার সব রসদ মজুত ছিল। ঠাকুমা থাকা আর না থাকার মধ্যে মায়ের পরিবর্তন সে লক্ষ্য করেছিল। মা আগের থেকে অনেক বেশি জেদী, সংসারে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্পর্ধা দেখাতে শুরু করেছিল ঠাকুমা মারা যেতেই। একটা বয়স অবধি মা-ই একমাত্র বন্ধু ছিল তার। তারপর বন্ধুর সংজ্ঞা পাল্টেছে কালের নিয়মে যখন সে নিজে স্কুল গণ্ডি ডিঙিয়ে কলেজের চৌকাঠে। একটু একটু করে শুরু হয়েছে স্বাধীন, আরো স্বাধীন হওয়ার বাসনা…

 

সাইকেলের চাকায় ওড়না আটকে কলেজের সামনে বিপজ্জনক পড়ে যাওয়া, কামিজ ছিঁড়ে যাওয়া ও দুর্ঘটনায় জখম হওয়া থেকে বাঁচাতে কেউ কেউ তার কাছে ছুটে এসেছিল। বন্ধুর মতো অথবা শুধু সাহায্যকারীর মতো। আসলে ঠিক কোনটা, সেটা ঐ মুহূর্তে বোঝার চেষ্টা করেনি। কামিজের বাঁ ঊরুর অনেকটা ছিঁড়ে যাওয়ায় প্রবল অস্বস্তি ঢাকতে সে কলেজে আর বাড়তি সময় না থেকে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলো। কেটে যাওয়া ঊরুতে রক্ত জমাট বেঁধে হলদে কামিজ ভিজিয়ে দিয়েছে।

-চল, তোকে বাড়ি অবধি পৌছে দি। শ্রেয়া আর রত্না, ওর ডান বাঁ দু পাশের দুই বন্ধু সত্যিই বাড়ি অবধি এসেছিলো। ওরা চলে যাবার পর নিজেই বাথরুমে গিয়ে পা এর কাটা অংশে প্রাথমিক শুশ্রুষা করে। এরপরই দরজায় বেল বেজে ওঠে…

-আমরা মুনের কলেজের বন্ধু। এই ফোনটা ফেরত দিয়ে গেলাম। ‘মুন’ পূর্ণিমার কলেজের ডাক নাম।

মায়ের হাতে মোবাইল সেটটা ঠিকঠাক পৌঁছল কিনা এটা বোঝার চেয়েও ‘মুনে’র তখন দেখার বিষয় ছিল যে ছেলে দুটি এলো তারা সেই ‘সাহায্যকারী’ কি না? সাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার সময় ফোনটা যে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল সে হুঁশ ওর ছিলনা।

বন্ধু ও এই গোত্ৰীয়রা উভয়ই পূর্ণিমার চারপাশ ঘিরে থাকে কলেজে। অথচ এই ঘটনার আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তার কাছে বন্ধুত্বের অনুরোধ এসেছিল দুই পুরুষ কলেজ পড়ুয়ার কাছ থেকে। যে অনুরোধের পোষাকি নাম ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েষ্ট’। তাদেরই উৎসাহী পায়ের ধুলো পড়েছিল কিনা তার বাড়িতে তা তার মায়ের কাছ থেকে যাচাই করার আগেই সব ছবিটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। বন্ধু সত্যিই বন্ধু কিনা তা ঘষেমেজে বুঝে নেওয়ার কোনো অবকাশ থাকেনা এ ধরনের বন্ধু প্রস্তাবে তাই সম্ভাব্য বন্ধুকে বুঝে নেওয়ার সময় চাওয়াতে কোনো অপরাধ স্বাভাবিক ভাবেই নেই। তবে চাপ না থাকা জীবনে এই প্রথম কোনো চাপ এসে পড়েছিল। সামান্য হলেও তার অজান্তে ঢুকে পড়েছিল ছোট্ট স্বপ্নবীজ।

অতঃপর অপেক্ষা। কিভাবে বীজ থেকে চারা, চারা থেকে…

আশপাশে রঙের চিহ্ন দেখতে পায় মুন ওরফে পূর্ণিমা। রঙের প্রতি জেগে ওঠা হঠাৎ অনুরাগ তাকে দ্রুত চিনিয়ে দিচ্ছিল এক একটি রঙিন ফুল। ক্রমশ তার চোখের সামনে ছড়িয়ে পড়ে বাগান। ‘বন্ধু প্রস্তাব’…

শরীরে তাপ বাড়তে থাকে। কারণ স্বপ্ন গতি পেলে শরীর উষ্ণ হয়। ‘বন্ধু প্রস্তাব’… রোজ একটু একটু করে আলো প্রবেশ করে তার চোখমুখে। মাঝরাতে অন্ধকার ফুঁড়ে ঝলসে ওঠে মোবাইলের পর্দা। এসবই ‘বন্ধু প্রস্তাব’…

 

তারপরই এলো সেই বন্ধুদিন। কলেজের আনাচে কানাচে চলছিল ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’র আদান প্রদান। করিডোরে সে কিছুক্ষণ একা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়ায় ‘বন্ধু’রা…! এক নয় একাধিক।

আজ কোন্ বিশেষ দিন সে হয়তো জানতো। তাই আয়নার সামনে নিজের আজকের ড্রেস তুলে ধরে সে বলে ওঠে ‘ডান্‌’।

হলদে স্লিভলেস টপ আর কালো লেগিংস পরে মায়ের কাছে ‘মা আসছি’ বলে সে যখন বিদায়ের অপেক্ষায় তখন বর্ষা দেবী ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ‘দুগ্‌গা দুগ্‌গা’ বলার সময় বুঝে গেল মেয়ে আজ বন্ধুসমাগমে ‘উড়বে’…। মায়ের মন তো। পূর্ণিমা আজ যেন সাক্ষাৎ ঝলমলে আলো। ঠিক কথা। তাদের বয়সে সময় অসময়ে ওড়াউড়ি লেগেই থাকে। হাতে রসদ সকলের সমান থাকলেও যা গড়পকেট যোগান তা থেকে টেনেটুনে এসব বিশেষ দিনে ডানা মেলা আটকায় না। যেখানে স্বপ্নের গাছ বীজ থেকে চারা হয়ে ক্রমশ মাথায় লম্বা হচ্ছে…সীমাহীন অনন্তে পৌঁছনোই যার লক্ষ্য। সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখেই সে ভাবতে থাকে সেই ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’ যা এখনো গ্রহণ ও বর্জনের মাঝে বকেয়া হয়ে আছে তার একটা মীমাংসায় পৌছনো এবার জরুরি! তা না হলে উল্টো দিক ভাবতেই পারে ‘অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত’! সেই প্রত্যাখ্যান হজম হবার কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। স্বপ্ন দেখার অধিকার তো সকলেরই। একটু আড়ালে ইশারায় তাকে ডেকে নিলো শুভ্র ও নীল। জীবনে এই প্রথম তার কাছে পুরুষ বন্ধুর হাতছানি। সে গোড়ায় দোলাচলে, তারপর এক পা দু পা ওদের পিছু নিয়ে আবার এক পা পিছিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তাকে অবাক করে দু জনের একজন ওর বাঁ হাত ধরে ফেলে। খানিকটা টান মেরে ওকে আরো খানিকটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করতেই ও টের পেলো একটা পুরুষালি জোর। কদিন ধরে তো এই শুভ্রকে নিয়েই ও ভেবে আসছে। যতটা শুভ্র ততটা নীল নয়। বেশ কিছু কাল্পনিক কথাবার্তা ইতিমধ্যে পার করে আসার পর আজ দেখার ছিল স্বপ্ন আর বাস্তবে মেলবন্ধন কতটা?

-কিরে, কি ভাবলি নিজেকে?

যে ‘ভিকি’ সে-ই যে শুভ্র সেটা মুন ঐ বন্ধু প্রস্তাব আসতেই বুঝেছিল। কলেজে অধিকাংশই ডাক নামে পরিচিত বেশি। ভিকির প্রশ্নে ঝাঁঝ দেখে অস্বস্তি বাড়ে তার। ততক্ষণে ঐ মুঠো থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছে সে।

কেন? পূর্ণিমার স্বাভাবিক জানতে চাওয়া।

-এতদিন কি প্রোফাইল না খুলে বসে আছিস?

এই হলো এক সমস্যা। যারা এই সমাজ মাধ্যম বা ‘সোশ্যাল সাইট’ যার পোষাকি নাম, তাতে নেই, তাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ‘ফেসবুক’ নামক যে ছায়াচ্ছন্ন সমাজ সেখানে দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে ‘সমাজে’র কেউ ভালো চোখে দেখেনা। ভিকি ওরফে শুভ্রর প্রশ্নের মধ্যে এই অনুপস্থিতির জেরা রয়েছে। যে মুন বা পূর্ণিমাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট বা বন্ধু প্রস্তাব পাঠিয়ে আজ অবধি কোনো ‘হ্যাঁ’ ‘না’ জবাব পায়নি। এর দুরকম মানে হতে পারে। এক, কদিন ‘সাইট’ না খুলে দেখা যাকে বলা যেতেই পারে ‘প্রোফাইল না খুলে বসে থাকা’… অথবা প্রস্তাবে মৌন থেকে বুঝিয়ে দেওয়া যে সে প্রত্যাখ্যান করছে। যার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা রহস্যময়…।

আমি ওয়েট করছিলাম। তুই অ্যাকসেপ্ট করলি না যে?

এবার খানিকটা লাল হয়ে উঠলো পূর্ণিমার চোখমুখ। গত কদিন সে অনেক ভেবেছে। স্বপ্ন দেখতে দেখতে মেঘের সওয়ার হয়েছে। এই প্রশ্নের সামনে পড়ার আগেই সে হয়তো চেয়েছে আর দু এক দিন কলেজে ওর হাবভাব দেখে ‘অ্যাকসেপ্ট’ অপশনে আঙুলের ডগা ছুঁইয়ে দেবে। বাকি ছিল আর দু একদিন। সেটা স্বাভাবিক। নারী ধর্মই হলো সম্মতিতে সময় নেওয়া। কিন্তু সেই আঙুল ছোঁয়ানো মানেই যে বন্ধুত্ব ঘোষণা তা ক্রমশ মনের চাপ তৈরি করা সম্পর্ক হবে এমন কথা তো নেই। কিন্তু এই প্রস্তাব পেশের দিন ও আজকের মধ্যে যে অনেকটা সময় কলেজে দু জনের চোখ চালাচালি হলো তাতে একটা মৃদু ভালোলাগা পূর্ণিমার অজান্তেই ওর মধ্যে ডালপালা মেলেছে। তাই তার আরো দু একদিন সময় নেওয়ার মানে ‘অ্যাকসেপ্ট’ এর ব্যাপ্তি নিয়ে সে ভাবছিল যা অবশ্যই সাধারণ চটজলদি আঙুল ছোঁয়ানো সম্মতি নয়। শুধুই বন্ধু সংখ্যা বাড়ানোর চালু খেলা নয়।

-(কে বললো করছি না। এই তো কাল পরশুর মধ্যেই অ্যাকসেপ্ট করতাম।)

মনের ভেতর থেকে কথা ঠোটের ডগা অবধি এসে জবাব আটকে গেল তার। শুধু চেয়ে থাকা কিছুক্ষণ অন্য চোখের দিকে। এর বেশি কিছু নয়। তারপর চোখ নামিয়ে নেওয়ার সময় আকস্মিক মন্তব্য অন্য জনের।

-চল আজ আমাদের সঙ্গে সিনেমা। এই ছেলেটি নীলাভ বা নীল। নামের সঙ্গে অনেক কিছুর মিল নেই। পূর্ণিমা বরং এর প্রস্তাবকে ‘ক্যানসেল’ বা বাতিল করবে ভেবেছিল।

পূর্ণিমা এ কথার উত্তর পেতে চেয়েছিল যার কাছ থেকে সে তখন নীরব…!

কোথাও যেন মিললো না ওর ভেবে রাখা ক্যানভাসের সঙ্গে।

-অসুবিধে কি? আজ তো ফ্রেন্ডশিপ ডে। বাড়িতে কিছু বলবে না। আবারও ‘নীল’ কথা বলে ওঠে। অন্যজন তখন ঘাড় ঘুরিয়ে মিচকি হাসতে ব্যস্ত। যা দ্বিতীয় বার অবাক করলো পূর্ণিমাকে। কারণ, ছবিটা আবারও মিললো না।

এবার পরিষ্কার অস্বস্তি প্রকাশ করে পূর্ণিমা। খুঁজতে থাকে ওর গণ্ডির বন্ধুদের। কাউকে আশেপাশে না পেয়ে ওদের কাছ থেকে সরে আসতে চায়। সরে আসতে চেয়ে যেই সে উল্টোদিকে ঘুরবে আবার হঠাৎ তার হাত চেপে ধরে শুভ্র। যখন সে আর স্বপ্নে দেখা শুভ্র নয়। সে অনেকটাই ‘ভিকি’। এক স্বঘোষিত ‘রোমিও’! এবার এতোটাই বিরক্ত হয় পূর্ণিমা যে হাত সরিয়ে নেবার সময় চিৎকার করে ওঠে। তার হাত ছেড়ে দেওয়ার সময় তাকে শাসানো হয় –

-সতীত্ব মারাচ্ছিস শালী। দেখি তোর কদিনের দেমাক। চারদিকের অন্য কোলাহলে এসব সোরগোল চাপা পড়ে গেল। ওরা দুজন ওখান থেকে সরে গেল। রাগ ও ভয়ে মাথাটা চরকির মতো ঘুরে গেলো। ভিকির শেষ কথা প্রচ্ছন্ন হুমকি ছাড়া কিছু নয়। প্রায় কাপতে কাঁপতে ফ্যাকাশে মুখে করিডোর ছেড়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায় কলেজের ‘মুন’। বন্ধুদের সব জানায়। বন্ধুরা এই অযাচিত বন্ধুত্ব প্রস্তাবের পেছনে আসল কারণটা আন্দাজ করে। তারা তাদের ‘মুন’কে সাবধান করে দেয়। আবারও সে সেদিনের মতো বন্ধুদের ঘেরাটোপে বাড়ি ফেরে। সেদিন সে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল। পা কেটে গিয়ে অঝোরে রক্ত পড়ছিল। আজও সে ক্ষতবিক্ষত। দুর্ঘটনায় স্বপ্নের ইমারত ধ্বসে পড়ায় সে আহত। তার মা-কে সে সব জানায়। এরপর শুধুই আতঙ্ক গ্রাস করে কদিন কেটে গেলো গোটা পরিবারের। ধর্ষণের হুমকি। ধর্ষণ আর ধর্ষণের আতঙ্ক দুটো আলাদা ব্যাপার। ধর্ষণের প্রতিরোধ হয়। প্রতিবাদ হয়। মোমবাতি জ্বলে। কিন্তু ধর্ষণের আতঙ্ক প্রতিরোধ করা সহজ নয়। আতঙ্ক দিন রাত এক করে তাকে ঘরবন্দি করে ফেলে। পূর্ণিমা কলেজ যাওয়া বন্ধ করে। রাস্তা ঘাটে বেরোলে ভয় করে।

কোনো সৌখিন জিনিশ হাত থেকে পড়ে গেলে যেমন মেঝেতে চোখের আতস কাচ ফেলে আমরা টুকরোগুলো সযত্নে কুড়িয়ে নিই তেমনই পূর্ণিমা তার গড়ে ওঠা স্বপ্ন সৌধের ভাঙা টুকরোগুলো তুলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। সে ক্রমশ অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে একদিন তার সাক্ষাত পায়।

 

তার সঙ্গে সমস্ত কথপোকথন সেরে সে আজ প্রস্তুত হয়ে আছে। মৃত্যু ও তার গোপন বোঝাপড়া সমাপ্ত। পূর্ণিমা তার শেষ শয়ান ও আবহ পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে।

বাগানের সাদা বিছানা। হিমশীতল তাপ ও নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। এই তিনটি শর্তই ‘মৃত্যু’ তাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বলে। সে করেছে। নিজের জন্যে বাকি ছিল শব্দ ও গন্ধ।

সে ঠিক করে ব্যাপারটা ঘটবে নিঃশব্দে। সুতরাং শব্দহীন মৃত্যু। আর অনেক ভেবে গন্ধটাও ঠিক করে সে। জন্মের সময় মায়ের শরীরের ওম্-তার একটা গন্ধ আছে। সেটা সে চায়।

রাতে মায়ের পাশ থেকে সে উঠে আসে তার শরীরের ওম্ মেখে। নিঃশব্দ রাতে সে বাগানে এসে শুয়ে পড়ে। রাত গভীর হলে সমস্ত ফুলের রং হারিয়ে সাদা হয়ে যায়। হিম নেমে আসে আকাশ থেকে।

তবে কি সত্যিই অমাবস্যার রাতে মৃত্যু হবে পূর্ণিমার। যেখানে এই মৃত্যুর কোনো সাক্ষী থাকবে না কেউ, জানবেনা। অবশেষে মৃত্যু নেমে এলো পূর্ণিমার মাথার কাছে। এরপর কেউ জানলো না কি হলো। পনেরো দিনের পক্ষকাল কাটলে দেখা যায় একটি মেয়ে যাকে পূর্ণিমার মতো দেখতে, সে হেঁটে চলেছে মফস্বলের রাস্তা দিয়ে। পূর্ণিমার রাত। ফ্যাকাশে ভাবলেশহীন মুখ। শরীরে কোনো রঙের লেশমাত্র নেই। সাদা ফ্যাকাশে শরীর। চোখ ঘোলাটে। মুখে কোনো কথা নেই। একটি স্বপ্নহীন মানুষ যার স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে সে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলেছে। মেয়েটির মৃত্যু না হলেও তার স্বপ্ন মৃত। সে কোথায় হেঁটে যাচ্ছে কেউ জানেনা। স্বপ্ন না থাকা মানুষের গন্তব্য ঠিক কোথায় কেউ বলতে পারেনা।

যেন রঙ নেই এমন কিছু হেঁটে যাচ্ছে ফ্যাকাশে ক্যানভাসের ওপর দিয়ে…

 

মতামত দিন

You cannot copy any content of this Website